বঙ্গোপসাগর : বিশ্বের সবচেয়ে বড় উপসাগর

বঙ্গোপসাগর হল ভারত মহাসাগরের উত্তর অংশে অবস্থিত প্রায় ত্রিভূজাকৃতি উপসাগর, যার পশ্চিমে রয়েছে ভারত ও শ্রীলঙ্কা, উত্তর দিকে রয়েছে ভারত ও বাংলাদেশ এবং পূর্ব দিকে রয়েছে মায়ানমার ও থাইল্যান্ড।

নামকরণ

বঙ্গোপসাগর নামের তেমন কোন উল্লেখযোগ্য ইতিহাস না থাকলেও প্রাচীন হিন্দু শাস্ত্রে একে বলা হয়েছে ‘মহোদধি, (অর্থাৎ, বিরাট জলাধার)। আর প্রাচীন মানচিত্রগুলিতে এই উপসাগরটি সাইনাস গ্যাঞ্জেটিকাস বা গ্যাঞ্জেটিকাস সাইনাস নামে পরিচিত ছিল, যার অর্থ গঙ্গা উপসাগর। 

আয়তন

২১,৭২,০০০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই উপসাগর বিশ্বের বৃহত্তম উপসাগর হিসেবে পরিচিত। যার সর্বাধিক প্রস্থ ১,৬১০ কিমি, আর গড় গভীরতা প্রায় ২,৬০০ মিটার এবং সর্বোচ্চ গভীরতা ৫,২৫৮ মিটার।

তাপমাত্রা

বঙ্গোপসাগরের পানিরাশির ঊর্ধ্বপৃষ্ঠের গড় বার্ষিক তাপমাত্রা প্রায় ২৮° সে। সর্বোচ্চ তাপমাত্রা থাকে মে মাসে ৩০°সে এবং সর্বনিম্ন তাপমাত্রা থাকে জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসে ২৫°সে। তবে তাপমাত্রার বার্ষিক পার্থক্য খুব একটা বেশি নয়, উপসাগরের দক্ষিণাংশে মাত্র ২°সে এবং উত্তরাংশে ৫°সে।

লবণাক্ততা ও বর্ণ

বঙ্গোপসাগরের পানিরাশির উপরের অংশে লবণাক্ততা ৩২% হতে ৩৪.৫% পর্যন্ত ওঠানামা করে এবং উপকূলীয় অঞ্চলে এর ব্যাপ্তি ১০% থেকে ২৫% পর্যন্ত। কিন্তু নদীর মোহনায় পানিরাশির ঊর্ধ্বপৃষ্ঠের লবণাক্ততা থাকে মাত্র ৫% কিংবা তার চেয়েও কম।

পানির বর্ণ ও স্বচ্ছতা  

বঙ্গোপসাগরের উন্মুক্ত অংশের পানির বর্ণ গাঢ় নীল এবং উপকূলের দিকে পানির বর্ণ ক্রমান্বয়ে পরিবর্তিত হয়ে হাল্কা নীল থেকে সবুজ বর্ণের হয়ে থাকে। পানির স্বচ্ছতা যথেষ্ট, কোন কোন স্থানে ৪০ থেকে ৫০ মিটার গভীরতা পর্যন্ত দেখা যায়। তবে গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র নদীর মোহনায় কম স্বচ্ছ এবং অত্যন্ত ঘোলা পানি পরিলক্ষিত হয়

দ্বীপপুঞ্জ

বঙ্গোপসাগরের অনেকগুলো দ্বীপ রয়েছে,যার মধ্যে - আন্দামান, নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ অন্যতম। গ্রেট আন্দামান হচ্ছে আন্দামান দ্বীপমালার প্রধান দ্বীপ; অন্যদিকে রিচি'র দ্বীপটি ক্ষুদ্রতম দ্বীপপুঞ্জের আওতাধীন। এছাড়া, আন্দামান, নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ এর ৫৭২টি দ্বীপের মধ্যে ৩৭টিতে অধিবাসী রয়েছে। বঙ্গোপসাগরের ঠিক মাঝামাঝি স্থানে আবস্থিত ভারতের আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জেই বেশীরভাগ মানুষ বাস করে, যা মোট জনগোষ্ঠীর ৬.৫%।বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বিপ সেন্ট মার্টিন এই বঙ্গোপসাগরে অবস্থিত,যার দৈঘ্য ৮ বর্গ কিলোমিটার।

                                                        Image Source : Myself

সমুদ্র বন্দর

ভারতের ব্যস্ততম সমুদ্রবন্দর বিশাখাপত্মম এবং বাংলাদেশের প্রধান দুটি সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর এই উপসাগরে অবস্থিত। মায়ানমারের পূর্ববর্তী রাজধানী ও সর্ববৃহৎ নগরী ইয়াংগুন, এই বঙ্গোপসাগরের একটি উল্লেখযোগ্য সমুদ্রবন্দর।

নদী ও নদীবন্দর

বেশ কিছু  বৃহত্তম নদী এই উপসাগরে এসে মিশেছে। এগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য গঙ্গা যার প্রধান দুই শাখানদী পদ্মা ও হুগলি, ব্রহ্মপুত্র যার শাখা নদী যমুনা ও মেঘনা, এছাড়া ইরাবতী, গোদাবরী, মহানদী, কৃষ্ণা, সুবর্ণরেখা, কাবেরী  নদীসমূহ বঙ্গোপসাগরে এসে মিশেছে।

বঙ্গোপসাগরের নিকটবর্তী গুরুত্বপূর্ণ বন্দরগুলি হল চেন্নাই, চট্টগ্রাম, কলকাতা, হলদিয়া, মঙ্গলা, পারাদীপ, বিশাখাপত্তনম ও ইয়াঙ্গন। বিশ্বের বৃহত্তম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার এই উপসাগরের তীরে বাংলাদেশে অবস্থিত। উল্লেখ্য যে, ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল সুন্দরবন গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা নদীর ব-দ্বীপকে ঘিরে গঠিত হয়েছিল।এমনকি, মায়ানমারের ইরাবতী নদীও  এ  উপসাগরে মিলিত হয়ে একসময় গভীর ও ঘন ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলের সৃষ্টি করেছিল।

মৎস্যক্ষেত্র

বঙ্গোপসাগরের অসংখ্য প্রজাতির চিংড়ি ও মাছের আবাসস্থল। যদিও উপসাগরের সর্বত্রই জলজ প্রাণী বিশেষ করে কাঁকড়া, শামুক জাতীয় ছোট ছোট সামুদ্রিক প্রাণী, ঝিনুক, শেল, হাঙ্গর ও মৎস্য সম্পদ রয়েছ, তবে কিছু কিছু বিশেষ স্থানে মৎস্য ঘনত্ব অধিক হারে বজায় থাকে, যে স্থানগুলি গুরুত্বপূর্ণ মৎস্যক্ষেত্র হিসেবে বিবেচিত। বঙ্গোপসাগরে এ পর্যন্ত চারটি মৎস্যক্ষেত্র শনাক্ত করা গিয়েছে। এগুলি হচ্ছে দক্ষিণের মৎস্যক্ষেত্র , দক্ষিণের দক্ষিণ মৎস্যক্ষেত্র , মধ্যভূমি  এবং সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ড মৎস্যক্ষেত্র।

বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী অঞ্চলে বসবাসরত মানুষরা মাছ ধরার উপর নির্ভরশীল। জেলেরা 26 থেকে 44 প্রজাতির সামুদ্রিক মাছ ধরে এই উপসাগর থেকে।  বছরে, গড়ে বঙ্গোপসাগর থেকে দুই মিলিয়ন টন মাছ ধরা হয়। বিশ্বের উপকূলীয় জেলেদের প্রায় 31% এই উপসাগরে বাস করে।

জোয়ারভাটা

বঙ্গোপসাগরে অর্ধ-আহ্নিক ধরনের জোয়ারভাটা সংঘটিত হয়ে থাকে, অর্থাৎ প্রতি ২৪ ঘণ্টা ৫২ মিনিট সময়কালে দুবার জোয়ার এবং দুবার ভাটা পর্যায়ক্রমে সংঘটিত হয়। অগভীর এলাকা, উপসাগরীয় এলাকা এবং মোহনা এলাকায় জোয়ারভাটা সর্বোচ্চ পরিলক্ষিত হয়। জোয়ার তরঙ্গের গড় উচ্চতা শ্রীলংকা উপকূলে ০.৭ মি এবং গাঙ্গার বদ্বীপ উপকূলে ৪.৭১ মি। বঙ্গোপসাগরে কয়েকটি নদীর মুখে জোয়ারভাটা স্রোত সৃষ্টি হয়, যেমন হুগলী এবং মেঘনা নদী।

বাংলাদেশের একমাত্র সমুদ্রসীমা হবার কারণে দেশের উন্নয়নে বঙ্গোপসাগরের বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। বাংলাদেশ নৌবাহিনী তাদের বাৎসরিক মহড়া এই সাগরেই করে থাকে এবং আন্তর্জাতিক মহড়াও এখানেই হয়ে থাকে।বাংলাদেশের সমুদ্র অঞ্চলে প্রচুর পরিমাণে প্রাকৃতিক গ্যাসের পাওয়ার সস্মবনা রয়েছ।

এছাড়া, কৌশলগত দিক দিয়ে বঙ্গোপসারগর ভারতের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ন, কারণ বঙ্গোপসারগরের উপকূল দিয়ে তাদের দুরবর্তী দ্বীপ আন্দামান  ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ রয়েছে, এছাড়া ভারতের কলকাতা, চেন্নাই, ও বিশাখাপত্মম এর মত ব্যস্ততম সমুদ্রবন্দর এই উপসারেই অবস্থিত।

ঘূর্ণিঝড় ও ঘূর্ণিবাত্যা

বঙ্গোপসাগরে প্রতি বছর বেশ কিছু ঘূর্ণিঝড় তৈরি হয়। যখন বঙ্গোপসাগরে উৎপত্তি হয়ে ৭৪ মাইল (১১৯ কিলোমিটার) গতিবেগে বাতাস ঘূর্ণায়মান অবস্থায় মৌসুমী ঘূর্ণিঝড়ে রূপান্তরিত হয় তখন তা সাইক্লোন বা ঘূর্ণিবাত্যা নামে আখ্যায়িত হয়। এ সাইক্লোন বা ঘূর্ণিবাত্যাই আটলান্টিক মহাসাগরে হারিকেন নামে পরিচিত।১৯৭০ সালে  এক প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ে  বাংলাদেশের ভোলায় কয়েক লক্ষ মানুষ প্রাণ হারান, যা স্মরণ করে আজো অনেক লোক শিউরে উঠেন।

নৌ ভূতত্ত্ব

সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ড হচ্ছে একটি ১৪ কিলোমিটার ব্যাপী বঙ্গোপসাগরের গভীর সমুদ্রের গভীর খাদ। গভীরতম এই উপত্যকা রেকর্ড আয়তন প্রায় ১৩৪০ মিটার। এখানকার ডুবো গিরিখাত  বিশ্বের বৃহত্তম ডুবো গিরিখাত।

দূষণ

প্রতি বছর জানুয়ারি থেকে মার্চ বা তার কাছাকাছি মাসগুলোতে দক্ষিণ এশিয়া এবং ভারত মহাসাগর থেকে আসা বায়ু দূষণ মেঘ বঙ্গোপসাগরের উপর জমা হয়। যার মধ্যে যানবাহনের ধোঁয়া, রান্নাবান্নায় নির্গত ধোঁয়া এবং শিল্প-কারখানার বর্জ্য অন্যতম।

বিভিন্ন ধরনের দূষক পদার্থের দ্বারা বাংলাদেশের সামুদ্রিক পরিবেশ প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষভাবে দূষণের শিকার হয়ে থাকে। উল্লেখযোগ্যভাবে বলা যায়, সমুদ্র উপকূলে অবস্থিত সাঙ্গু গ্যাসক্ষেত্র থেকে গ্যাস উৎপাদন এবং কুতুবদিয়া উপকূলীয় গ্যাসক্ষেত্রের আবিষ্কারের উদ্দেশ্যে সমুদ্রবক্ষে খনিজ নিষ্কাশন ও বৃহৎ মাত্রার খননকাজ পরিচালনা, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলার উপকূলবর্তী দ্বীপসমূহে সঞ্চিত সৈকত বালি আহরণ প্রভৃতি কর্মকান্ডের ফলে বঙ্গোপসাগরের পরিবেশ দূষিত হচ্ছে।


YouTube Link: বঙ্গোপসাগর : বিশ্বের সবচেয়ে বড় উপসাগর

আদম পাহাড়, শ্রীলঙ্কা

 আল্লাহতায়ালা হজরত আদম আলাইহিস সালামকে জান্নাত থেকে দুনিয়াতে পাঠানোর পর তিনি ফেরেশতাদের সাহায্যে বর্তমান শ্রীলঙ্কার ‘সেরেনদ্বীপে’ আসেন। বঙ্গোপসাগর ও ভারত সাগরের মাঝামাঝি স্থানে দ্বীপটি অবস্থিত। ২৫/৩০ মাইল দূর থেকে পাহাড়টি দেখা যায়। এ পাহাড়ের ঠিক মাঝ বরাবর সবচেয়ে উঁচু স্থানটিকে অবস্থিত পৃথিবীর প্রথম মানব হজরত আদম (আ.) এর পদচিহ্ন।পাহাড়টি এ্যাডামস পিক নামে এখন পরিচিত। 


এই জায়গাটি খ্রিস্টান, হিন্দু, বৌদ্ধ ও মুসলিম এই চার ধর্মের অনুসারীদের কাছে অতি পবিত্র স্থান। এই পায়ের ছাপ  এর দৈর্ঘ্য ৫ ফুট ৭ ইঞ্চি এবং প্রস্থ ২ ফুট ৬ ইঞ্চি। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা বিশ্বাস করেন এই পদচিহ্নটি গৌতম বুদ্ধের, হিন্দুরা বিশ্বাস করেন এই পদচিহ্নটি তাদের দেবতা শিবের, এবং মুসলমান ও খ্রিষ্টানরা বিশ্বাস করেন এটি পৃথিবীর প্রথম মানব আদম -এর।

মুসলমান ও খ্রিস্টানদের বিশ্বাস পৃথিবীর প্রথম মানুষ মানব জাতির আদি পিতা হজরত আদম নিষিদ্ধ ফল ভক্ষণের কারণে আল্লাহ কর্তৃক স্বর্গ থেকে বিতাড়িত হন এবং এখানে প্রথম পৃথিবীতে নামেন। মুসলমানদের মতে আদম ৯০ ফুট লম্বা ছিলেন। আদম পৃথিবীতে এসে চরম অণুতপ্ত হয়ে পড়েন এবং তার ভুলের জন্য আল্লাহর দরবারে ক্ষমা প্রার্থণা করতে থাকেন। তখন তিনি ভুলের প্রায়শ্চিত্ত স্বরূপ এক পায়ে হাজার বৎসর দাড়িয়ে থাকেন এবং কান্না-কাটি করতে থাকেন। তার ফলস্বরূপ এখানে তার পবিত্র পায়ের পদচিহ্ন এর দাগ পড়ে যায়।থিবীর প্রথম মানব হজরত আদম (আ.)-এর নাম জানো, তাঁর নামেই নামকরণ হয়েছিল এই পাহাড়ের। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, হজরত আদম (আ.)-এর ডান পায়ের চিহ্নটা কেবলামুখী অর্থাৎ পবিত্র কাবার দিকে ফেরানো।  

বৌদ্ধ ধর্মমতে খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০ অব্দে পায়ের ছাপটি আবিষ্কার হয়। আবিষ্কৃত হবার পর পদচিহ্নের চারপাশে ঘেরাও করে রাখা হয়েছে। এই চূড়ার উচ্চতা ৭৩৫৯ ফুট বা ২২৪৩ মিটার। চূড়াটির চারপাশে সবুজের বিপুল সমারোহ ও আশেপাশে রয়েছে অসংখ্য ছোট নদী ও ঝরণা।

এই স্থানে বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল মাস পর্যন্ত সূর্যের আলো পড়ে না আবার মে থেকে নভেম্বর মাস পর্যন্ত মেঘের ঘনঘটা বা বৃষ্টিও সেখানে পড়ে না।এই পায়ের চিহ্নটি সংরক্ষণের জন্য শ্রীলঙ্কা সরকার একটি চার কোণা বিশিষ্ট বিল্ডিং তৈরি করেছে। সেখানে প্রবেশের জন্য রয়েছে একটি শক্ত লোহার গেট।

পাহাড়টি সুউচ্চ হওয়ার কারণে সেখানে পৌঁছানো খুবই কষ্ট সাধ্য। সেখানে পৌছাতে হলে প্রথমে নৌকায় চড়ে কিছু পথ যেতে হয়, তারপর পায়ে হেঁটে উঁচু পাহাড়ে উঠতে হয়। পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছানোর জন্য পাহাড়ের গা বেয়ে তিনটি রাস্তা তৈরি করা হয়েছে। এছাড়াও পাহাড়টির অনেকাংশ সবুজ গাছে ঢাকা থাকার কারণে এই পাহাড়ে রয়েছে অনেক বিষাক্ত সাপ ও পোকামাকড়।এ পাহাড়ে আরোহণ করা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছার পথ গভীর জঙ্গলের ভিতর দিয়ে। সেই জঙ্গল নানারকম ঝুঁকিপূর্ণ। তবে চূড়ার কাছাকাছি একটি ধাতব সিঁড়ি আছে। তাতে রয়েছে ৪ হাজার ধাপ। এখানে পৌঁছতে সময় লাগে কমপক্ষে ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টা।  

বছরে মাত্র তিন থেকে চার মাস এ পাহাড়ে আরোহণ করা যায়। বছরের অন্য সময়টাতে এতে আরোহণ অসম্ভব। কারণ, এ পাহাড় তখন লুকিয়ে যায় মেঘের ভেতর। চারদিক থেকে মেঘে জেঁকে ধরে অদৃশ করে ফেলে পাহাড়টাকে।

বিশ্বের যেসব নামকরা পর্যটক এই চূড়াটি ভ্রমণ করেছেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ইবনে বতুতা ও মার্কো পোলো। ১৫০৫ সালে শ্রীলঙ্কা সফরে এসেছিলেন পর্তুগিজ এক নাগরিক। তিনি এ পাহাড়কে বলেছেন পিকো ডি আদম। সেই থেকে এই পাহাড়ের নাম আদম পাহাড়। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই পায়ের ছাপটি  অবিকল রয়ে গেছে।


YouTube Link: দম আঃ এর পায়ের চিহ্ন। আদম পাহাড় শ্রীলঙ্কা । আদম পাহাড়ের ইতিহাস।

পবিত্র কাবা শরিফের ইতিহাস

সৌদি আরবের মক্কায় অবস্থিত মুসলমানদের সবচেয়ে পবিত্র স্থান  মসজিদুল হারাম।এই মসজিদের কেন্দ্রেই রয়েছে পবিত্র কাবা শরিফ। কাবা শরিফ মুসলমানদের কিবলা, অর্থাৎ যেদিকে মুখ করে মুসলিমরা সালাত আদায় করে। হজ বা উমরা পালনের সময় মুসলমানরা কাবাকে ঘিরে তাওয়াফ করে।

মসজিদুল হারাম, মক্কার হারাম এলাকায় কাবাঘরকে কেন্দ্র করে নির্মিত মসজিদ। এই এলাকাকে হারাম বলার কারণ হচ্ছে, ইসলাম আগমনের অনেক বছর আগে থেকেই এই এলাকায় হত্যাসহ যেকোন অপকর্ম নিষিদ্ধ ছিল।


হারাম এলাকার প্রাণকেন্দ্র হলো মসজিদুল হারাম, আর এই মসজিদের কেন্দ্রস্থলে কালো বর্ণের ঘরটিই হলো কাবা শরীফ শরিফ বা মহান আল্লাহর সম্মানিত কাবাঘর।


পৃথিবীতে সর্বপ্রথম মহান আল্লাহ নির্দেশে ফেরেশতারা কাবাঘর নির্মাণ করেন। কাবাঘরকে উল্লেখ করে মহান আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনের সুরা আল-ইমরানের ৯৬ নাম্বার আয়াতে বলেন, “নিশ্চই সর্বপ্রথম ঘর যা মানুষের ইবাদত রূপে নিরূপিত হয়েছে, তা ঐ ঘর যা মক্কাতে অবস্থিত”।

এরপর হযরত আদম (আঃ) আল্লাহ তায়ালার আদেশে কাবা শরীফ পুনঃনির্মাণ করেন।

হজরত নূহ (আ.)-এর সময় সংঘটিত মহাপ্লাবনের পর হজরত ইব্রাহিম (আ.) ও তাঁর ছেলে হজরত ইসমাইল (আ.) আল্লাহর নির্দেশে পুনরায় কাবাঘর সংস্কার ও পুনর্নির্মাণ করেন। ইবরাহিম (আ) কাবার পূর্ব কোণে হাজরে আসওয়াদ পাথর স্থাপন করেছিলেন, যা হাদিস অনুযায়ী বেহেশত থেকে আগত। এই পাথর একসময় দুধের মত সাদা ছিল কিন্তু মানুষের গুনাহ শোষণ করার কারণে এটি কালো হয়ে গিয়েছে।

মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নবুয়ত প্রাপ্তির ৫ বছর আগে কাবাঘর সংস্কার করে মক্কার বিখ্যাত কোরাইশ বংশ। মহানবী হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) জীবিত অবস্থায় ৬ হিজরীতে আব্দুলাহ ইবনে জোবায়ের (রাঃ) কাবা শরীফ সংস্কার করেন। এরপর হাজ্জাজ বিন ইউসুফ ৭৪ হিজরীতে কাবা শরীফ সংস্কার করেন।

৪১৬ হিজরিতে বাদশাহ ফাহদ কাবার বাইরের দেয়াল সংস্কার করেন। ১৪১৭ হিজরিতে তিনি কাবাগৃহের ছাদ, খুঁটি, দেয়ালসহ সব কিছু সংস্কার করে নতুন ধাঁচে ঢেলে সাজান। 

এর পর থেকে নির্মাণের পরিবর্তে কাবা শরিফের সংস্কারকাজ অব্যাহত রয়েছে। ৯১ হিজরিতে উমাইয়া খলিফা ওয়ালিদ বিন আবদুল মালিক কাবাগৃহে ব্যাপক সংস্কার করেন।তাঁর এ নির্মাণকাজকে কাবার সর্বশেষ নির্মাণ বা সর্বশেষ সংস্কার হিসেবে অভিহিত করা হয়। এযাৎ কাবা শরিফ ১২ বার সংস্কার করা হয়েছে। 

সৌদি গেজেট মতে, কাবাগৃহের উচ্চতা পূর্ব দিক থেকে ১৪ মিটার।  পশ্চিম দিক থেকে ১২.১১ মিটার। উত্তর দিক থেকে ১১.২৮ মিটার। দক্ষিণ দিক থেকেও ১২.১১ মিটার।

ভূমি থেকে কাবার দরজার উচ্চতা ২.৫ মিটার। দরজার দৈর্ঘ্য ৩.০৬ ও প্রস্থ ১.৬৮ মিটার। বর্তমান দরজা বাদশা খালেদের উপহার, যা নির্মাণে প্রায় ২৮০ কিলোগ্রাম স্বর্ণ ব্যবহার করা হয়েছে। 

কাবা শরীফের সিলিংকে তিনটি কাঠের পিলার ধরে রেখেছে। প্রতিটি পিলারের ব্যাস ৪৪ সে.মি.। 

পিলারের কাঠগুলো এতই শক্ত প্রকৃতির যে, এর মতো বিকল্প কাঠ পাওয়া যায় না। এগুলো প্রসিদ্ধ সাহাবী হযরত আব্দুল্লাহ বিন জুবাইর (রা:) স্থাপন করেছিলেন। বর্তমানে এ কাঠনির্মিত খুটির বয়স ১ হাজার ৩৫০ বছর।

কাবা শরিফের ভেতরের দেয়ালগুলো সবুজ ভেলভেটের পর্দা দিয়ে আবৃত। এই পর্দাগুলো প্রতি তিন বছর অন্তর অন্তর পরিবর্তন করা হয়।

কাবা ঘরের গিলাফের রঙ কখনোই কালো ছিল না। বর্তমানে কাবা ঘরের গিলাফের রঙ কালো ব্যবহার করা হয়। আব্বাসীয় খলিফাদের পরিবারের প্রিয় রঙ ছিল কালো। তাদের সময় থেকে কাবা ঘরে কালো গিলাফ পরানো হয়। এর আগে কাবা ঘরে সবুজ, লাল ও সাদা রঙের গিলাফ ব্যবহার করা হতো।

কাবা ঘরের ভেতরে যে কোনো দিকে ফিরেই নামাজ আদায় করা যায়। তাতে কোনো বিধি-নিষেধ নেই।আবার কাবা ঘরের বাইরে যে কোনো পাশে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়া যায়।

দেয়ালের ওপরের অংশে রয়েছে সাঁটানো সবুজ রেশমি কাপড়। তাতে কোরআনের বিভিন্ন আয়াত স্বর্ণখচিত করে অঙ্কিত। বছরে দুইবার কাবাঘর পরিষ্কার করা হয়। পরিষ্কার করতে ব্যবহৃত হয় জমজমের পানি, খাঁটি গোলাপ জল এবং উন্নত মানের সুগন্ধি উদ। কাবার গিলাফ তৈরি করা হয় ৬৭০ কেজি রেশম দিয়ে। গিলাফের ওপর দিকে সোনার প্রলেপকৃত রুপার চিকন তার দিয়ে কোরআনের বিভিন্ন আয়াত ক্যালিগ্রাফিখচিত করা।

 মোট পাঁচ টুকরা গিলাফ বানানো হয়। চার টুকরা চারদিকে এবং পঞ্চম টুকরাটি কাবার দরজায় লাগানো হয়। টুকরাগুলো মজবুতভাবে সেলাইযুক্ত। 

মক্কা বিজয়ের পর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাবা ঘরের চাবি বনি শায়বাহ গোত্রের ওসমান ইবনে তালহা রাদিয়াল্লাহু আনহুর কাছে হস্তান্তর করেন। বংশ পরম্পরায় এখনো তারাই কাবা ঘরের চাবির দায়িত্ব পালন করে আসছেন।

কাবাঘরের ৪টি কোণের আলাদা নাম আছে

(১) হাজরে আসওয়াদ (২) রুকনে ইরাকী (৩) রুকনে শামী ও (৪) রুকনে ইয়ামেনী।


১৯৪১ সালে সপ্তাহব্যাপী প্রবল বৃষ্টির কারণে কাবা চত্বরসহ মক্কার বিভিন্ন এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। আর সে সময় কাবা ঘর জিয়ারতকারীদের কেউ কেউ সাঁতার কেটে কাবা ঘর তাওয়াফ করেন। সেসময় সপ্তাহব্যাপী বৃষ্টির কারণে কাবা চত্বরে প্রায় ৬ ফট পানি জমে যায়।

কাবা ঘরের পাশেই আছে মাকামে ইব্রাহিম নামের একটি অলৌকিক পাথর। কাবা শরিফের পূর্ব-উত্তর পাশে সোনালি বেষ্টনীতে পায়ের ছাপযুক্ত যে পাথরখণ্ডটি সংরক্ষিত রয়েছে তা হলো মাকামে ইব্রাহিম। মাকাম অর্থ স্থান বা দাঁড়ানোর জায়গা। এ পাথরের ওপর দাঁড়িয়ে হজরত ইব্রাহিম (আ.) কাবাঘরের প্রাচীর গাঁথতেন

বেহেশতি একটি পাথর হলো হাজরে আসওয়াদ। আসওয়াদ মানে কালো, হাজর মানে পাথর। এই কালো পাথরটি হজরত আদম (আ.) জান্নাত থেকে সঙ্গে নিয়ে আসেন। এই পবিত্র পাথরের দৈর্ঘ্য ৮ ইঞ্চি ও প্রস্থ ৭ ইঞ্চি। বর্তমানে এটি ছোট ছোট ১২টি খণ্ডে বিভক্ত, এর ৮ টুকরা দৃশ্যমান। বর্ণিত আছে, এটি কিয়ামতের দিন তাকে স্পর্শকারী বা চুম্বনকারীর পক্ষে আল্লাহর কাছে সুপারিশ করবে। 

অনেকদিন ধরেই কাবা ঘরের বিভিন্ন ধরনের বিশেষ তালা ও চাবির ব্যবহার হয়ে আসছে। দীর্ঘ দিন পরপর পরিবর্তন করা এসব তালা কিংবা চাবি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত থাকার তথ্য পাওয়া যায়। এখন পর্যন্ত কাবা শরিফে ৫৮টি তালা-চাবির নিবন্ধনের তথ্য পাওয়া যায়।যার মধ্যে তুরস্কের সাবেক রাজধানী ও প্রাচীন শহর ইস্তাম্বুলে তোপকাপি জাদুঘরেই রয়েছে ৫৪টি চাবি।

প্রথমে কাবা শরিফ কিবলা ছিল না। বরং প্রথম কিবলা ছিল জেরুজালেমে অবস্থিত মসজিদুল আকসা। মদীনায় হিজরতের ষোল মাস পর কুরআনের নির্দেশনা অনুযায়ী কিবলা পরিবর্তিত হয়ে বর্তমানের কিবলা অর্থাৎ কাবা শরীফ কিবলা হিসেবে নির্ধারিত হয়।

কাবাঘরের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব সৌদি রাজপরিবারের। সৌদি সরকারের প্রধান (বাদশাহ) কাবা শরীফের মোতায়াল্লির দায়িত্বে থাকেন


YouTube Video Link

পবিত্র কাবা : ইতিহাস ও অজানা তথ্য |

পাপের শহর লাস ভেগাস

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেভাদা অঙ্গরাজ্যের একটি শহর হচ্ছে লাস ভেগাস। সারা বিশ্বে এটি প্রমোদ নগরী হিসেবে বিখ্যাত। এই শহরকে মনোরঞ্জনের রাজধানীও...